হক আমিন, ঢাকা :
ষাটের দশকের ঢাকা- তখনকার শহর আজকের মতো কংক্রিটের উঁচু উচু দালান ছিল না, বরং নদীকেন্দ্রিক এক প্রানচঞ্চল জনপদ ছিল। আর সেই জনপদের হৃদস্পন্দন ছিল বুড়িগঙ্গা । নদীর বুকে সারি সারি পাল তোলা নৌকা, বাতাসে ফুলে ওঠা সাদা পাল আর মাঝিমাল্লাদের সুরেলা ডাক- সব মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য, যা আজ শুধুই স্মৃতি ।
সেই সময় নদীপথ ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম । দেশের দিক্ষণাঞ্চল থেকে ধান, পাট, নারকেল, কাঠ কিংবা মসলা বোঝাই নৌকা ভেসে আসতো ঢাকা বুড়িগঙ্গার ঘাটে । পাল তোলা বিশাল বিশাল নৌকাগুলো দৃর থেকেই নজর কাড়তো। নদীর বুকে যেন চলমান এক শিল্পকর্ম- বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা। মাঝিরা বাতাসের গতি প্রকৃতি বুঝে পাল মেলতেন, আবার কখনও ভাঁজ করতেন । প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে চলার সেই দৃশ্য ছিল অসাধারণ ।
রাজধানী ঢাকার প্রবীণরা এখনও স্মৃতি আউড়ান , ভোরবেলা বুড়িগঙ্গার ঘাটে দাঁড়ালে দেখা যেত কুয়াশা ভেদ করে ধীরে ধীরে ভেসে আসছে পাল তোলা নৌকা । নদীর জলে প্রতিফলিত হতো পালের ছায়া । সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যের আলোয় সোনালি রঙে রাঙানো সেই পাল যেন এক নজড় কারা সৌন্দর্য তৈরি করতো । নদী তখন ছিল জীবন্ত, প্রাণবন্ত ।
কিন্তু সময় বদলেছে । যান্ত্রিক নৌযান, লঞ্চ, কার্গো জাহাজের দখলে চলে গেছে নদীপথ। শিল্পায়ন ও নগরায়নের চাপে বুড়িগঙ্গার জলও আজ আগের মতো নেই। দূষণ দখল আর অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। পাল তোলা নৌকার সেই মনোরম দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না।
আজকের প্রজন্ম কল্পনা করতে পারবে না, কীভাবে বাতাসই ছিল নৌকার চালিকাশক্তি । কীভাবে নদীর ঢেউ, আকাশের মেঘ আর বাতাসের দিকনির্দেশনা মিলিয়ে গড়ে উঠতো এক নান্দনিক চলাচল ব্যবস্থা । সেই পাল তোলা নৌকাগুলো শুধু পরিবহনের মাধ্যম ছিল না, ছিল নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, জীবনযাপন আর ঐতিহ্যের প্রতীক ।
বুড়িগঙ্গার বুকে হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান কতটা সুন্দর হতে পারে । ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেলেও স্মৃতির ভাঁজে রয়ে গেছে পাল তোলা নৌকার দিনগুলো । হয়তো একদিন নদী আবার তার স্বচ্ছতা ফিরে পাবে, আর মানুষও ফিরিয়ে আনবে সেই ঐতিহ্যের কোন অংশ- নতুনভাবে, নতুন প্রজন্মের জন্য ।


