
‘বিরোধপূর্ণ’ জমিতে একটি ছোট্ট মেহগনি গাছ কাটা নিয়ে দুই প্রতিবেশির বিরোধ। সেই বিরোধে গ্রামের দুটি পক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। গাছ কাটা নিয়ে বিরোধের জেরে দুই চাচাতো ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার ঘটনায় ৬১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনের নামে মামলা হয়। আসামিদের বেশিরভাগই দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ।
ঘটনার পর চার মাস পার হলেও প্রতিপক্ষের হামলা ও সহিংসতার ভয়ে আসামি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই বাড়িতে ফিরতে পারছে না বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের বিরুদ্ধে বদলা নিতে বাদীপক্ষের লোকজন আসামিদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রতিপক্ষের লুটপাট ও ভাঙচুরে নিঃস্ব কয়েকটি পরিবারের ঘরে ফেরার অবস্থা নেই। আশ্রয় নিয়েছে আশপাশের গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। চার মাস আগের হত্যাকাণ্ড ঘিরে এমন ‘অশান্ত’ পরিস্থিতি বিরাজ করছে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চন্দননগর ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা করছেন।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, বসতভিটার জমি নিয়ে ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের রেজাউল ইসলাম ও তাঁর ভাতিজা শরিফুল ইসলাম ও ময়নুল হকের সঙ্গে একই গ্রামের কাশেম হাজী ও তাঁর ছোট ভাই লাল চানের বিরোধ চলছিল। বিরোধপূর্ণ জমিতে বেশ কয়েকটি মেহগনি গাছ লাগানো আছে। গত ৯ এপ্রিল বিরোধপূর্ণ সেই জমি থেকে একটি মেহগনি গাছ কাটেন শরিফুল। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে পর দিন কাশেম হাজী ও লাল চানের নেতৃত্বে তাঁদের পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি নিয়ে প্রতিপক্ষ শরিফুলের ওপর হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই শরিফুলের মৃত্যু হয়। এ সময় আবার উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে শরিফুলের চাচাতো ভাই আইজুল, চাচা রেজাউল, শরিফুলের ছোট ভাই ময়নুলসহ অন্তত আটজন আহত হন। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আইজুলের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শরিফুলের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বাদী হয়ে লাল চান, কাশেম হাজী, উপজেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক শহিদুল ইসলামসহ ৬১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে নিয়ামতপুর থানা পুলিশ। এজহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক শহিদুলসহ অনেকেই জামিনে আছেন।
গত শনিবার মামলার আসামি কাজেশ হাজী ও তাঁর ভাই লাল চানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, হামলা ও ভাঙচুরের চিহ্ন নেই। বাড়ির দরজা-জানালা ভাঙা, মোটরসাইকেল, ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রের ভাঙা অংশ পড়ে আছে। ভাঙা ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ব্যবহার্য জিনিসপত্র। একই চিত্র আসামি শফিকুলসহ আরও ১০-১২টি বাড়িতে।
আসামি কাশেম হাজী ও লাল চানের বাবা কছিমুদ্দিন বলেন, ‘কার আঘাতে কীভাবে খুন হলো জানা নেই। আমার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত ও আইন-আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। কিন্তু আমি, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনীরা মারামারির আশপাশ যায়নি। আমরা মামলার আসামিও নয়। আমার ওপর হামলা করেছে বাদীপক্ষের লোকজন। বাড়িঘর হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। ঘরের সব মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। এমনকি খেতের ফসল পর্যন্ত কাটতে পারিনি। চার মাস হলো বাড়িতে ফিরতে পারছি না। আমাদের মতো গ্রামের ৪১টি পরিবারের একই অবস্থা। বাদীপক্ষের লোকজনের হামলা ও সহিংসতার ভয়ে অন্তত ১৫০ লোক ঘরে ফিরতে পারছে না। এই লোকগুলো দিনের পর দিন মানবেতর জীবন-যাপন করছে।’
আসামি তোতার স্ত্রী আলতাফনূর বলেন, ‘খুনের ঘটনার পর আমাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বাড়ির জিনিসপত্র লুট হয়ে গেছে। পাঁচ মাস হলো বাড়িতে যেতে পারছি না। দুই সান্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আছি। তাদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে না পারায় তারা স্কুলে যেতে পারছে না। এভাবে আর কতো দিন।’
আসামি আজগরের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, ‘৪১টি পরিবারের প্রতিটি বাড়ীর ঘরের ধান, চাল, আসবাবপত্র যা ছিলো সব লুট করে নিয়ে গেছে। হত্যাকা-ের দিন আমি বাড়িতে ছিলাম। ওরা যখন বাড়িতে হামলা করতে আসে তখন আমি প্রাণ ভয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হই। এরপর আমি কয়েকবার বাড়িতে ঢুকতে চাইলে তাঁরা আমাদের বাধা দিচ্ছে। কেবল বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট করেও তাঁরা ক্ষান্ত হয়নি। ৪১ পরিবারের প্রায় ২৫০ বিঘা জমির বোরো ধান কেটে নিয়েছে বাদীপক্ষের লোকজন। জমিতে আমন ধান রোপন করতে পারেনি অনেকে।’
এ বিষয়ে মামলার বাদী নিহত শরিফুল ইসলামের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বলেন, ‘মাত্র একটা ছোট্ট মেহগনি গাছ কাটার জন্য ওরা হামার স্বামী ও তার চাচাতো ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। যাঁরা হত্যা করেছে তাদের যেন ফাঁসি হয়। আসামিরা গ্রেপ্তারের ভয়ে বউ-ছাওয়াল লিয়ে প্যালে গেছে। হামাগের লোকজন কাউকে বাড়িত থেকে বের করে দেয়নি। ওদের বাড়িঘরের মালামাল আত্মীয়-স্বজনেরা নিয়ে গেছে। হামাগের কোনো লোকজন লুটপাট করেনি।’
এ বিষয়ে নিয়ামতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত তারা অবশ্যই অপরাধী এবং তাদেরকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু আসামেিদর পরিবারের যাঁরা এই অপরাধের সাথে জড়িত না তাঁদের সুস্থ্য, স্বাভাবিক এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ বাড়িতে বসবাস করার অধিকার আছে। আসামিদের পরিবারের লোকজন বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না সাংবাদিকদের মাধ্যমে এমন অভিযোগ পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ দেয়নি। তবে এ ধরণের খবর পাওয়ার পর মামলার আইও-কে (তদন্ত কর্মকর্তা) নিয়ে ওই গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে জানতে পেরেছি আসামিপক্ষের ১৬-১৭টি পরিবার ইতোমধ্যে বাড়িতে ফিরেছেন। বাকিরা যেন নির্ভয়ে বাড়িতে ফিরেন এমন আহ্বান জানানো হয়েছে। উভয়পক্ষকে গ্রামে শান্তিপূর্ণ সহবস্থান রাখার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। গ্রামে আর যেন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না হয় এ ব্যাপারে পুলিশ সজাগ রয়েছে।