
রম্য লেখক, আমিনুল হকঃ
ভাটির দেশ, নদীমাতৃক বাংলাদেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ অসংখ্য নদনদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে সবুজ শ্যামল এ দেশজুড়ে। নদীই এই দেশের প্রাণ—জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোথায় নদ, কোথায় নদী—কোনটা বড়, কোনটা ছোট—এই নদীনির্ভর ভূখণ্ডের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে আছে মানুষের আশা-ভালোবাসা, দুঃখ-সুখ ও সংগ্রামের গল্প।
নদীর সঙ্গে এক গভীর মায়ায় জড়ানো গ্রামবাংলার মাঝি-মাল্লা ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন। নদীতে নামলেই যেন তাদের মুখে হাসি ফুটে, পেট ভরে আহার জোটে। একসময় পাল তোলা নৌকার সারি আর মাঝিদের গলায় ভেসে আসা ভাটিয়ালি গান ছিল এই নদীবাংলার প্রাণস্পন্দন। “মন মাঝি তুই বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না”—এমন অমর পঙ্ক্তি শুধু সাহিত্য নয়, এক জীবন্ত সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
মরমী শিল্পী আবদুল আলীমের কালজয়ী গানে সেই নদীজীবনের সুর এখনও ভেসে আসে—
“কে যাইও ভাটির দেশের নাইয়ারে ভাটিয়ালি গান গাইয়া”,
“নঙর ছাড়িয়া দে রে মাঝি ভাই”,
“রূপালী নদীরে রূপ দেইখ্যা তোর হইয়াছি পাগল”—
এসব গানে মিশে আছে বাংলাদেশের নদী, মানুষের মায়া, আর সুরের অনন্ত টান।
কিন্তু সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে সেই সৌন্দর্য, সেই প্রাণচাঞ্চল্য। এখন আর নেই পাল তোলা নৌকা, নেই মাঝিদের সুরেলা ডাক। বর্ষায় নদীগুলো কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলেও অন্য সময় তাদের বুকজুড়ে দেখা যায় ধু ধু বালুচর। নগর সভ্যতার যুগে নদীর উপর গড়ে উঠেছে ইট-পাথরের সেতু, আর নদীগুলো হারিয়েছে তাদের প্রাচীন জৌলুস ও গুরুত্ব।
তাইতো শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের গলায় আজও বেজে ওঠে মর্মস্পর্শী সুর— “গীতিময় এই দিন চিরদিন বুঝি আর রইলো না…”