হক আমীন:
উত্তরবঙ্গের জেলা কুড়িগ্রাম – ভাওয়াইয়া গানের জন্য দেশজুড়ে সুনাম রয়েছে । তিস্তা পারের হাওয়া, চরাঞ্চলের ধুলোবালি আর গরুর গাড়ীর কড়মড় শব্দ মিলেই যে সুরের জন্ম দিয়েছে, তারই এক অমর নিদর্শন ভাওয়াইয়া গান ” ওকি গাড়ীয়াল ভাই।” সময়ের স্রোত পেরিয়ে গানটি আজও মানুষের কন্ঠে বেঁচে আছে, কিন্তু যে গাড়ীয়াল ভাইকে ঘিরে এই আর্তি, তিনি কি এখনও আছেন?
সম্প্রতি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বের হয়েছিলাম । শহর ছেড়ে গ্রামে, গ্রাম পেরিয়ে আরও দূরে। মনে হয়েছিল- হয়তো কোথাও মেঠোপথের ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে যাবে গরুর গাড়ি, হয়তো বাঁশির সুরের মতো ভেসে আসবে ভাওয়াইয়ার সুর। কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলে। চারিদিকে এখন পিচঢালা পাঁকা পথের জাল। এক সময় যেখানে কাঁদা মাটির পথ ছিল, আজ সেখানে বিটুমেনের চকচকে আস্তরণ ।
গরুর গাড়ীর বদলে চোখে পড়ে অটো, সিএনজি ইজিবাইক, মটরসাইকেল। ব্যস্ত সড়কে হর্নের শব্দ, ধীর লয়ের চাকার ঘূর্ণন আর নেই। সেই গাড়ীয়াল ভাইয়ের অপেক্ষায় প্রেয়সী গেয়েছিল ” ওকি গাড়ীয়াল ভাই কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে—,” আজ তিনি যেন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে।
প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানাযায়, দু, তিন দশক আগেও রংপুর- কুড়িগ্রাম অঞ্চলে গরুর গাড়ী ছিল প্রধান বাহন। হাটবাজারে ধান পাট সরিষা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহন করতে গরুর গাড়ীর বিকল্প ছিল না । সেই গাড়ীয়ালদের ঘিরেই রচিত হয়েছিল অগণিত ভাওয়াইয়া গান। এ গানগুলোই ছিল পথের সাথী, জীবিকার প্রতীক, আবার ভালোবাসার রূপকও । কিন্তু সময় বদলেছে ।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দ্রুতগতি জীবনের প্রয়োজন আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গরুর গাড়ী এখন প্রায় বিলুপ্ত । উন্নয়ন অবশ্যই সস্তির- পাঁকা রাস্তা মানে সহজ যাতায়াত, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন । তবে এরই ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে আমাদের একটুকরো লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য ।
তবে কি সত্যিই হারিয়ে গেছে গাড়ীয়াল ভাই? হয়তো বাস্তবের পথ থেকে সরে গেছেন। কিন্তু গানের ভুবনে তিনি এখনও অমর । ভাওয়াইয়ার সুরে, মাঠির গন্ধে, নদীর বাতাসে আজও তিনি বেঁচে আছেন ।
নতুন প্রজন্ম অটো বা ইজিবাইকে চড়ে গেলেও, কোন এক নির্জন বিকেলে যখন ভাওয়াইয়ার সুর ভেসে আসে, তখন মনে হয়- দূরে কোথাও এখনও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে সেই গরুর গাড়ী।
পাঁকা রাস্তার যুগে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন জাগে- উন্নয়নের এই পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা কি আমাদের লোকসংস্কৃতির শিকড় ভুলে যাচ্ছি? নাকি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই বদলে নিচ্ছে তার রূপ?
“গাড়ীয়াল ভাই” এর খোঁজে বেরিয়ে তাকে না পেলেও, ফিরে এসে উপলব্ধি করেছি- তিনি হারিয়ে যাননি, তিনি রয়ে গেছেন আমাদের স্মৃতি, সুর আর সংস্কৃতির গভীরে । আর সেই কারণেই কুড়িগ্রামের মাটিতে ভাওয়াইয়ার সুর কখনও থামবে না।


